পোস্টগুলি

চার হুনাফার কাহিনী

ছবি
  ড. আদনান ফায়সাল ইতিহাসগ্রন্থ ঘাঁটলে ঐ কুস ইবনে সাঈদা ছাড়াও আরো ৪ জন হানিফ (বহুবচন – হুনাফা) পাওয়া যায়। (“হানিফ” শব্দের অর্থ হলো “ফিরে যাওয়া”। হানিফ বা হুনাফা হলো তারাই যারা পৌত্তলিকতার যুগে পৌত্তলিকতার দিকে না গিয়ে বরং নিজের বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করে ফিরে গিয়েছে এক আল্লাহর দিকে।) আসুন এই চার হুনাফা সম্পর্কে জানি। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন – প্রিয়নবী মুহাম্মাদ(সা) এর  জন্মের কয়েক বছর আগে (ধারণা করা যেতে পারে ১৫-২০ বছর আগে), কুরাইশরা একবার এক মহা উপাসনা উৎসব বা পূজার আয়োজন করে। বিশালকার আয়োজন আর অনেক লোকের জনসমাগম হবে – তাই তারা উৎসবটা মক্কার বাইরে আয়োজন করে। সমস্ত মক্কাবাসী যখন সেই মহাপূজা যোগ দিতে মক্কার বাইরে চলে গেল, তখন ৪ জন মানুষ মক্কায় রয়ে গেল। তারা কা’বার পাশে যখন একজন আরেকজনকে দেখল – তখন একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল যা বোঝার – এদের ৪ জনেই কেউই মূর্তিপূজাকে ঠিক বলে মনে করে না। এই চার ব্যক্তি কারা ছিল? এদের নাম হলো – ওয়ারাকা ইবনে নোওফেল ইবনে আসাদ (ইনি খাদিজা(রা) এর চাচাত ভাই কিন্তু বয়সে প্রায় ৪০-৫০ বছর বড়), উবা...

ইসলাম-পূর্ব রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধর্মীয় অবস্থা

ছবি
  ইসলাম আসার আগের আরবের আশে পাশে মূলত দুইটি সাম্রাজ্য ছিল।   রোমান সাম্রাজ্য (বা বাইজেনটিন সাম্রাজ্য)  ও   পারস্য সাম্রাজ্য (বা সাসানিদ সাম্রাজ্য) । রোমান সাম্রাজ্য ছিল খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী আর পারস্য সাম্রাজ্য  ছিল জোরাস্ট্রিয়ান (আরবী: মাজুস) ধর্মের অনুসারী যারা আগুনের উপাসনা করত। প্রশ্ন দাঁড়ায় রোমান সাম্রাজ্য কোন ধরনের খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিল? আজকে আমরা যে খ্রিষ্টান দেখতে পাই – তাদের মতই কি ওদের ধর্মবিশ্বাস ছিল? এ বিষয়টা বুঝতে হলে আমাদের খ্রিষ্টান ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে একটু জানতে হবে। মহান আল্লাহ নবী ঈসা(আ) কে আসমানে তুলে নেয়ার ৩০-৪০ বছরের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম মূলত তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর প্রথম দল হলো – নস্টীসিজম (Gnosticism)।  এদের ধর্মবিশ্বাস খুবই জটিল প্রকৃতির ছিল। এরা বিশ্বাস করত – মহাজাগতিক দ্বৈতবাদে (cosmological dualism – সৃষ্টা ও সৃষ্টি একই অস্ত্বিত্তের দ্বৈত অবস্থান), সন্ন্যাসজীবনে, ডসেটিসমে (পৃথিবীতে ঈসা(আ) এর কোন শরীর ছিল না, ছিল শুধু অবমূর্তি, তাই তাকে অত্যাচার করা হলেও তিনি ব্যাথা পাননি)।  এই বিশ্বাসের খ্রিষ্টানরা খুব ...

সালমান আল ফারসির (রা) রোমাঞ্চকর যাত্রা

ছবি
  সালমান আল ফারসির (রা) রোমাঞ্চকর যাত্রা ড. আদনান ফায়সাল কেউ যদি দ্বীনের সন্ধানে আন্তরিকতার সাথে লেগে থাকে, এক সময় না এক সময় মহান আল্লাহ তাকে পথ দেখান। এই বিষয়টার উদাহরণ আমরা পাই বিখ্যাত সাহাবী সালমান আল ফারসির ঘটনায়। কে ছিল এই সালমান আল ফারসি? মুসনাদ ইমাম আহমদ গ্রন্থে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিস থেকে আমরা জানি – সালমান আল ফারসি থাকত ইরানে, তার জন্ম হয়েছিল এক  অগ্নি-পূজারী (জোরাস্ট্রিয়ান / মাজুস ) ধর্মের অনুসারী বাবার ঘরে, জায়ান নামক এক গ্রামে । তার বাবা ছিল একজন জমিদার (ফার্সী: দিহকান), যে ছিল যেমন ধনী, তেমনই ক্ষমতাবান। এলাকার সবাই সালমানের বাবাকে মেনে চলত, সমীহ করে কথা বলত। সালমানের বাবা মাজুস (অগ্নি-পূজারী) ধর্মের গভীর অনুরাগী ছিল। আর সে সালমানকে পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে সবচেয়ে বেশী ভালবাসত। কিশোর সালমানকে সে সব সময় আগলে রাখত। একমাত্র মন্দির ছাড়া আর কোথাও যেতে দিত না। সালমানও তার সারাটা দিন মন্দিরেই কাটাত। সালমানের ছিল জ্ঞান-পিপাসু মন। সে তাদের মাজুস ধর্ম সম্পর্কে যা পেত তাই শিখে নিত। এই ধর্ম অনুসারে – মন্দিরে যে আগুন জ্বলে তা ভগবানের প্রতীক, তাই কোনভাবেই এই আগুনকে কখ...

নায়িলা ও আসসাফ এর জঘন্য কাহিনী

ছবি
নায়িলা ও আসসাফ এর জঘন্য কাহিনী   ড. আদনান ফায়সাল মূর্তিপূজা করা খারাপ – এটা আমরা সবাই বুঝি। কিন্তু, সেই মূর্তি যদি ব্যভিচারীর মূর্তি হয় তাহলে তো আরো খারাপ, কিন্তু সেই খারাপ কতটা সীমাহীন হতে পারে – যদি সেই ব্যাভিচারী স্বয়ং মহাপবিত্র কা’বা ঘরের ভিতর ব্যভিচার করতে যেয়ে ধরে পড়ে? আপনি কি কল্পনা করতে পারেন – এই রকম চরম পর্যায়ের ব্যভিচারীদেরকে মানুষ ঘৃণা তো দূরে থাক, শ্রদ্ধা করত, ভালবাসত, এমনকি তাদের মূর্তির পূজা পর্যন্ত করত! আপনার কাছে এটা এখন শুনতে অসম্ভব মনে হতে পারে – কিন্তু ইসলাম-পূর্ব আরবে এমনটাই ঘটেছিল। এই ব্যভিচারী যুগলের নাম ছিল নায়িলা ও আসসাফ। আসুন ঘটনাটার বিস্তারিত জানা যাক।  ইতিহাসের বইগুলো থেকে আমরা জানি, আয়েশা(রা) বলেন – আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই নায়িলা আর আসসাফ এর গল্প শুনেছি। এরা ছিল এক প্রেমিকযুগল। এই কপোত-কপোতি অন্তরঙ্গ হওয়ার মত কোন জায়গা পাচ্ছিল না। আর কোন খালি জায়গা না পেয়ে এরা অবশেষে কা’বাঘরের ভিতরে যেয়ে এক হয় (আউযুবিল্লাহ)। তাদের এই কুকর্মের শাস্তিস্বরুপ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের দেহকে পাথরে রূপান্তর করে দেন। কুরাইশবাসীরা এদের পাথুরে দে...

যে সব কারণে মানুষ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়

ছবি
  আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম, মক্কা-মদীনায় এক সময় মূর্তিপূজা ছিল না। আমর ইবনে লুহাই সিরিয়ায় বেড়াতে যেয়ে আমালিক জাতির মানুষের মূর্তিপূজার উৎসব দেখে মুগ্ধ হন, আর সাথে করে মক্কায় নিয়ে এসে কা’বা ঘরের ঠিক সামনে স্থাপন করেন। মূর্তির সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে যায় আরববাসী, আর ধীরে ধীরে মূর্তিপূজাকে ধর্মের অংশ হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়, কি কারনে আরবের লোকজন ইব্রাহিম(আ) এর প্রচারিত ধর্ম ছেড়ে আমর ইবনে লুহাই এর কথায় প্রলুব্ধ হয়ে মূর্তিপূজা শুরু করেছিল? এর কারণ খুঁজতে গেলে, মূলত: চারটি কারণ পাওয়া যায়। ১) উন্নত জাতির অন্ধ-অনুকরণ:  পার্থিব উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে, আমালিকরা আরবদের চেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী জাতি ছিল। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ছিল, আর্কিটেকচার, বড় বড় বিল্ডিং, যুদ্ধাস্ত্র – সব কিছুতেই তারা আরবদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কাজেই, আমর ইবনে লুহাই মক্কাবাসীকে খুব সহজেই এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে – দেখ, ঐ আমালিকরা সবকিছুতেই আমাদের চেয়ে উন্নত। কাজেই, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসও নিশ্চয়ই উন্নত কিছু হবে। কাজেই তাদের দেশ থেকে যেটাই ইম্পোর্ট করি না কেন, সেটা ভাল কিছুই হবে।...

সূরা আল লাইলের ৫ এবং ৬ নাম্বার আয়াতে

ছবি
  সূরা আল লাইলের ৫ এবং ৬ নাম্বার আয়াতে খুবই চমৎকারভাবে কুরআন বিশ্বের জন্য কোন ধরণের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আশা করে তা তুলে ধরা হয়েছে। "ফা আম্মা মান আ'তা, ওয়াততাকা, ওয়াসদ্দাকা বিল হুস্না।" এখানে তিনটি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। ১। আ'তা (اَعۡطٰی) - যে দান করে। ২। ওয়াততাকা (وَ اتَّقٰی ۙ) - যে সচেতন থাকে, আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে এবং সতর্ক থাকে। ৩। ওয়াসদ্দাকা বিল হুস্না (وَ صَدَّقَ بِالۡحُسۡنٰی) - এবং চূড়ান্ত সত্যকে গ্রহণ করে নেয়। যে সবচেয়ে সুন্দর জিনিসের মধ্যে সত্যকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এটা বুঝা একটু কঠিন। পরে এটা ব্যাখ্যা করছি। আ'তা মানে দানশীল হওয়া। দান করা। আপনার পক্ষে যত বেশি সম্ভব দান করা। আল্লাহ যখন বলেছেন اَعۡطٰی (আ'তা) তিনি উল্লেখ করেননি আপনি কী দান করেন? তিনি শুধু বলেছেন আপনি মানুষকে দিতে পছন্দ করেন। মানুষকে শুধু দিয়ে যান। যদি কাউকে সময় দেয়ার সুযোগ থাকে, মুচকি হাসি দেওয়ার সুযোগ থাকে, টাকা-পয়সা, যে কোনো সাহায্য, উপদেশ যা কিছুই আপনার পক্ষে দেওয়া সম্ভব আপনি শুধু দিয়ে যান (a giving person)। এ শব্দটি মানব জাতির প্রতি আমাদের সদগুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। মূলত মানবতার প...

বেলায়াত ও ওলী

ছবি
বেলায়াত ও ওলী আরবী (الوِلَايَـة، بِكَسْرِ الْوَاوِ وَفَتْحِهَا) বিলায়াত, বেলায়াত বা ওয়ালায়াত অর্থ নৈকট্য, বন্ধুত্ব বা অভিভাবকত্ব (closeness, friendship, guardianship)। ‘বেলায়াত’ অর্জনকারীকে ‘ওলী’ বা ‘ওয়ালী’ (الولي) বলা হয়। ওলী অর্থ নিকটবর্তী, বন্ধু, সাহায্যকারী, অভিভাবক ইত্যাদি। ‘ওলী’ অর্থেরই আরেকটি সুপরিচিত শব্দ ‘মাওলা’ (مَوْلٰى) ‘মাওলা’ অর্থও অভিভাবক, বন্ধু, সঙ্গী ইত্যাদি (master, Protector, friend, companion)। ইসলামী পরিভাষায় ‘বেলায়াত’ ‘ওলী’ ও ‘মাওলা’ শব্দের বিভিন্ন প্রকার ব্যবহার রয়েছে। উত্তরাধিকার আইনের পরিভাষায় ও রাজনৈতিক পরিভাষায় এ সকল শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত। তবে বেলায়াত বা ওলী শব্দদ্বয় সর্বাধিক ব্যবহৃত (وَلَايَةُ الله) ‘আল্লাহর বন্ধুত্ব’ ও (وَلِيُّ الله) ‘আল্লাহর বন্ধু’ অর্থে। এ পুস্তকে আমরা ‘বেলায়াত’ বলতে এ অর্থই বুঝাচ্ছি। আরবী ‘তরীক’ বা ‘তরিকত’ শব্দের অর্থ রাস্তা বা পথ। ফারসীতে এ অর্থে ‘রাহ’ শব্দটি ব্যবহৃত। আমরা এ পুস্তকে আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভের পথ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। ওলীদের পরিচয় প্রদান করে আল্লাহর বলেন: ﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَ...